বাংলাদেশ পুলিশ এর সকল বিভাগের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও কাজ

পুলিশী সেবা

ঔপনিবেশিক আমলে পুলিশ বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, একটি স্বাধীন দেশে পুলিশ বাহিনী জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করার কথা। একারণে এখন পুলিশ ফোর্স না বলে পুলিশ সার্ভিস বলা হয়ে থাকে।
কিন্তু বিভিন্ন প্রয়োজনে কিভাবে পুলিশের সেবা নিতে হয়, কোথায় কি প্রক্রিয়ায় যোগাযোগ করতে হয়, ইত্যাদি তথ্য ঠিকমত না জানার কারণে অনেকেই বিভিন্ন প্রয়োজনে বা বিপদে সহজে পুলিশের দারস্থ হন না। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের সাহায্য নেয়ার প্রক্রিয়াটি খুব বেশি জটিল নয়। আবার পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নেয়া, পাসপোর্ট করা প্রভৃতি ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। এসব বিষয় চিন্তা করে পুলিশের সেবা আর সেবা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য থাকছে এবার।

বাংলাদেশ পুলিশ

শান্তি শপথে বলীয়ান বাংলাদেশ পুলিশ আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা, নির্যাতিত মানুষের পাশে বন্ধুর মতো দাড়ানো এবং অপরাধীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে থাকে। বাংলাদেশ পুলিশের হেড কোয়ার্টার গুলিস্তানের নগর ভবনের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। ঢাকা মহানগরীর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। পুলিশকে সহায়তা এবং বাংলাদেশের মানুষকে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় আবদ্ধ করতে আরও রয়েছে – র‍্যাব, ডিবি, এসবি, সিআইডি, বিট পুলিশ এবং রেলওয়ে পুলিশ। বর্তমানে অনলাইনে জিডি করা যায়। এছাড়া নিপীড়িত জনগণকে তাৎক্ষণিক পুলিশি সেবা প্রদান করার জন্য চালু হয়েছে ওয়ান স্টপ সার্ভিস। পুলিশ বাহিনী আইন শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন, ইমিগ্রেশন এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।
পর্তুগীজ ভাষা হতে পুলিশ শব্দটির উদ্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশের মূলনীতি হচ্ছে: শান্তি -শৃঙ্খলা-নিরাপত্তা-প্রগতি। এ পর্যন্ত ১১টি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশ নিযুক্ত হয়েছে।বাংলাদেশ পুলিশ সম্পর্কে কিছু তথ্য
• বাংলাদেশের একমাত্র পুলিশ একাডেমী রাজশাহী জেলার চারঘাট থানার সারদায় অবস্থিত।
• কনস্টেবলদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে পি.টি.সি বা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার বলে। বাংলাদেশে ৪টি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার (পি.টি.সি) আছে। যথা: (ক) নোয়াখালী (খ) মহেড়া, টাংগাইল (গ) খুলনা ও (ঘ) রংপুর।
• পুলিশ বাহিনীর জন্য ২ স্তরের পুরস্কার রয়েছে। যথা (ক) বীরত্ব পুরস্কার, (খ) জিএস মার্ক। বীরত্ব পুরস্কার ৩টি। যথা (ক) বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল, (খ) প্রেসিডেন্ট পুলিশ মেডেল, (গ) আই.জি ব্যাজ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের সেবায় দৃষ্টান্তমূলক কাজের জন্য বীরত্ব পুরস্কার দেওয়া হয়। G.S Mark হল সার্ভিস বইতে প্রশংসাপূর্ণ মন্তব্য লিখন যা পুলিশ বা তদূর্ধ কর্মকর্তাগণ দিয়ে থাকেন।
• পুলিশ বাহিনীর জন্য ২ প্রকার শাস্তির ব্যবস্থা আছে। যথা: (ক) লঘু দন্ড ও (খ) গুরু দন্ড।
• রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স-এর স্মৃতিসৌধটি ১৯৭১ সনের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাক বাহিনীর আক্রমণে নিহত পুলিশদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়। ১৯৮৯ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়।

 

পুলিশের বিভাগসমূহ

বাংলাদেশ পুলিশের বিশাল কর্মযজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য এর কার্যক্রমকে বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। বিভাগগুলো হচ্ছে:

  • সোয়াত
  • শিল্পাঞ্চল পুলিশ
  • রেল পুলিশ
  • হাইওয়ে পুলিশ
  • নৌ-পুলিশ
  • ট্রাফিক পুলিশ
  • আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন
  • র‌্যাব
  • এসবি
  • ডিবি
  • সিআইডি

স্পেশাল ওয়েপনস এন্ড ট্যাকটিস (SWAT)

অনেক সময় সন্ত্রাসী ধরতে গিয়ে কিছু কিছু অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে যেখানে নিয়মিত অভিযানে অংশ নেয়া পুলিশ সদস্যদের পক্ষে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব নয়; সেক্ষেত্রে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা, জিম্মি উদ্ধার অভিযানে দক্ষ এবং আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত বাহিনীর প্রয়োজন হয়। কারণ কিছু অপরাধী গোষ্ঠী উন্নত অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পুলিশের মোকাবিলা করে। সাজোয়া যান, সাব মেশিনগান, স্নাইপার রাইফেল, নাইট ভিশন গগলস সহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক সরঞ্জাম নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একটি এলিট ফোর্স গঠন করা হয়ে থাকে।
১৯৬৮ সালে লস এঞ্জেলস পুলিশ প্রথম সোয়াট গঠন করে। ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে সোয়াট গঠন করা হয়।
বাংলাদেশ পুলিশেও ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় সোয়াট গঠন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা প্রশিক্ষকগণ প্রথমে ঢাকায় ৪২ দিনের একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তারপর তাদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশেষায়িত দলটি গঠন করা হয়।
এই বাহিনীর জন্য উন্নতমানের সাজ-সরঞ্জাম, স্লাইপার রাইফেল ও যানবাহনসহ সহায়ক অন্যান্য সবকিছুতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সহায়তা দেয়। বিশেষায়িত মামলা তদন্ত, বোমা অপসারণ, জিম্মি উদ্ধার, বোমা বিস্ফোরণ মামলা তদন্ত ইত্যাদিতে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের সোয়াট গঠন করা হয়েছে।

রেলওয়ে পুলিশ

বৃটিশ শাসনামলে রেলওয়ে প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীর এর বিস্তৃতি ঘটানো হয়। বিস্তৃতির সাথে সাথে চুরি-ডাকাতি সহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখা দেয়। এজন্য প্রথমে আধাসামরিক বাহিনী গঠন করা হয় এবং পরে রেল পুলিশ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর পুরো রেলওয়ে পুলিশকে একটি রেঞ্জের আওতাভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর রেল পুলিশে মৌলিক কোন পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে রেল সদর দপ্তর চট্টগ্রামে সরিয়ে নেয়া নয়।
বর্তমানে রেল পুলিশের দুটি জোন রয়েছে, চট্টগ্রাম এবং সৈয়দপুর জোন। এ দুটি জোনে দু’জন পুলিশ সুপার পুলিশ প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। চট্টগ্রাম জোনে আটটি রেলওয়ে থানা, সতেরটি ফাঁড়ি ও চারটি সার্কেল রয়েছে। আর সৈয়দপুর জোনে আটটি থানা, সতেরটি ফাঁড়ি এবং চারটি সার্কেল রয়েছে। একজন ডিআইজির নেতৃত্বে রেল পুলিশ পরিচালিত হচ্ছে।

শিল্পাঞ্চল পুলিশ

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের শিল্প কারখানার উন্নয়ন এবং বিস্তারের সাথে সাথে শিল্পাঞ্চলে নতুন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। বিভিন্ন ধরনের শ্রমিক অসন্তোষকে পুঁজি করে বিভিন্ন মহল শিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায়। এর ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন রপ্তানীমুখি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে ভাংচুরের ঘটনা ঘটে।
এমতাবস্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে বিশেষ পুলিশ বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এজন্য ঢাকা রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা আশুলিয়াতে ক্ষুদ্র অবয়বে গাজীপুর জেলা পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীনে শিল্পাঞ্চল পুলিশ ২০০৯ – এর জুন থেকে পরিচালিত হতো। ক্রমে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলসহ সীতাকুন্ডে জাহাজকাটার এলাকাটিও শিল্পাঞ্চলও পুলিশের দায়িত্বভুক্ত এলাকায় এনে শিল্পাঞ্চল-এর জন্য বৃহত্তর ও পারঙ্গম একটি সুশৃঙ্খল পুলিশ সংস্থা গড়ার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ৩১ অক্টোবর ২০১০ তারিখ থেকে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে শিল্পাঞ্চল পুলিশের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। এতে একজন মহাপরিচালক ৫ জন পরিচালকসহ ১৮ টি পদে সর্বমোট ১৫৮০ জন নিয়োজিত আছেন।

নৌ পুলিশ

কোম্পানী শাসনামলে ১৭৯৩ প্রথম জল-পুলিশ গঠন করা হয়। বৃটিশ শাসনামলের শেষ পর্যনত বেসামরিক পুলিশী ধাঁচে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশের নিয়ন্ত্রনে জল পুলিশ থেকে যায়। বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটলে জল-পুলিশের শাখা ভাসমান থানাগুলো সংশ্লিষ্ট থানার নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয় এবং জেলা পুলিশ সুপারের আয়ত্তাধীন করা হয়। পাকিস্তান আমলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সমুদ্র তীরবর্তী বন্দর, চট্টগ্রাম, মংলা ও নদীতীরবর্তী বড় শহর, খুলনা, বরিশাল, চাঁদপুর, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মত বৃহৎ নদীবন্দরগুলোর অপরাধ দমন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জন্য গঠিত নৌ-পুলিশ ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ। করাচিতে এ সদর দফতর স্থাপিত হয়েছিল। নদী ও সমুদ্র বন্দরগুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নৌ-পুলিশ মোতায়েন থাকত, বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জেলা পুলিশের সহযোগিতায় তারা কর্তব্য পালন করত। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে নৌ-পুলিশকে রিভার ব্যাটালিয়নের সঙ্গে একীভূত করা হয়। আর এ সদর দফতর স্থাপিত হয় বরিশাল শহরে।
এই পুলিশ বাহিনী স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরনের মাধ্যমে শ্রমিক এবং মালিকপক্ষ উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য চেষ্টা করে থাকে। মালিকপক্ষ যাতে যথাসময়ে শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দেয় সেদিকেও জল-পুলিশ লক্ষ্য রাখে।

ডগ স্কোয়াড

১৯৯৮ সালের ২০ নভেম্বর পৃথিবীর অন্যন্য দেশের পুলিশ বাহিনীর মত বাংলাদেশে পুলিশেও ডগ স্কোয়াড যুক্ত হয়। ২৫টি কুকুর নিয়ে এই ডগ স্কোয়াডের যাত্রা শুরু হয়। ২৫টি কুকুরের মধ্যে ১২টি জার্মান সেফার্ড এবং ১৩টি ল্যাবরাডার জাতের কুকুর ইংল্যান্ডের চিলপট ইউকে লিঃ- এর কাছ থেকে সরবরাহ নেয়া হয়। বিদেশী দুই জন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশী ডগ স্কোয়াডে অফিসারদেরকে কুকুর পরিচালনাসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। এ ডগ স্কোয়াডের দায়িত্বে আছেন একজন পুলিশ কমিশনার, একজন সহকারী পুলিশ সুপার, একজন ইন্সপেক্টর, একজন সার্জেন্ট, তিন জন হাবিলদার, চার জন নায়েক ও ত্রিশজন কনস্টেবল। কুকুরের খাদ্য তৈরির জন্য দুই জন বাবুর্চি ও দুইজন ক্যানেল ক্লিনারও আছেন। মিরপুর ১৪ নং সেকশনে কুকুরগুলোর জন্য ক্যানেল ও আনুসঙ্গিক বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।

সিআইডি (CID)

পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেসটিগেশন ডিপার্টমেন্ট সংক্ষেপে সিআইডি নামে পরিচিত। ঢাকার মালিবাগে এর প্রধান কার্যালয়টি অবস্থিত। একজন এডিশনাল আইজি সিআইডি প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

সিআইডির কার্যক্রম:
• তদন্তেরর স্বার্থে পুলিশ কর্মকর্তা এবং সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা।
• অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর পলাতক অপরাধীর পরিচিতি সংগ্রহ, সনাক্তকরণ ইত্যাদির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে সাহায্য করা।
• বিশেষ ধরনের অপরাধ ও পেশাদার অপরাধীর তথ্য সংগ্রহ করা। যাতে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে অন্য তদন্তকাজে সহায়তা করা যায়।

অপরাধী ও অপরাধকে সনাক্তকরণের জন্য সিআইডির নয়টি বিভাগ আছে:
1. ফিংগার প্রিন্ট ব্যুরো,
2. ফুট প্রিন্ট ব্যুরো,
3. হ্যান্ড রাইটিং ব্যুরো,
4. ব্যালেস্টিক ব্যুরো,
5. মাইক্রো এ্যানালাইসিস ব্যুরো,
6. কেমিকেল এ্যানালাইসিস ব্যুরো,
7. জালনোট শাখা,
8. ফটোগ্রাফিক ব্যুরো,
9. সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো।

স্পেশাল ব্রাঞ্চ-এসবি (SB)

পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ সংক্ষেপে এসবি নামে পরিচিত। ষাটের দশকে ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনের তৎপরতা বৃদ্ধিসহ আন্দোলন পরিস্থিতিতে তৎকালীন সরকার দেশের প্রতিটি জেলায় পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকার মালিবাগে এর সদর দফতর অবস্থিত।

পরবর্তীতে এ সংস্থার উপর আরো কিছু নতুন দায়িত্ব অর্পিত হয়। এসব দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে, আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, ছাত্র তৎপরতা ও শ্রমিক তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করা, রাজনৈতিক সংগঠনসমূহের তৎপরতা সম্পর্কে সতর্ক দৃষ্টি রাখা এবং সীমান্ত সংক্রান্ত বিষয় সরকারকে অবহিত করা। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর এ সংস্থাটি আরো সুগঠিত করা হয় এবং ভিআইপি বা রাজকীয় অতিথিদের নিরাপত্তার জন্য এ সংস্থার সাথে যুক্ত করা হয় কিছু সংখ্যক প্রটেকশন ফোর্স। এ ফোর্স বাংলাদেশের প্রত্যেক মহানগর পুলিশ ফোর্সের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রে একজন অতিরিক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁকে সাহায্য করার জন্য কয়েকজন পুলিশ সুপার ও ডেপুটি পুলিশ সুপার, আর তার দাফতারিক স্টাফ রয়েছেন। রেঞ্জের অধীনস্থ প্রত্যেকটি জেলা সদরে একজন ইন্সপেক্টর এবং তার অধীনে সাব-ইন্সপেক্টর, সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর, হেড কনস্টেবল ও ওয়াচার কনস্টেবল রয়েছেন। জেলা স্পেশাল ব্রাঞ্চের সামগ্রিক দায়িত্ব জেলা পুলিশ সুপারের উপর ন্যস্ত থাকে। তিনি সংশ্লিষ্ট এলাকার সকল বিষয়ের সংবাদসমূহ কেন্দ্রীয় অফিসে প্রেরণ করেন।

স্পেশাল ব্রাঞ্চের কার্যাবলী:
• বিভিন্ন সভা সমিতিতে নেতাদের দেয়া বক্তৃতা রেকর্ড করা এবং আপত্তিকর বক্তব্য প্রদানকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।
• রাজনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে দৈনিক প্রতিবেন (DR) সাপ্তাহিক গোপনীয় প্রতিবেদন (WCR) ইত্যাদি তৈরি করে যথা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো।
• বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ড সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে যাচাই করা এবং সেগুলো লিপিবদ্ধ করা।
• রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকারক কোন কর্মকান্ড ও আইন-শৃঙ্খলা অবনতিকারক কর্মকান্ড সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই ও প্রয়োজনীয় প্রতি ব্যবস্থার জন্য দ্রুত যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা।
• সরকারী, আধা সরকারী, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি প্রার্থীদের ভেরিফিকেশন।
• নিরাপত্তা পরীক্ষণ (Security Vetting)।
• দেশী/বিদেশী অতি গুরুত্বপূর্ণ (VVIP) এবং গুরুত্বপূর্ণ (VIP) ব্যক্তিগণের নিরাপত্তা দেয়া।
• কেপিআই ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহের জরিপ, পরিদর্শন এবং সেগুলোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া।
• সীমান্তে উত্তেজনা বিষয় ও উপজাতীয়দের রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কার্যকলাপ ও গতিবিধির উপর গোয়েন্দা নজর রাখা।
• রাজবন্দিদের অন্তরীণ সংক্রান্ত কার্যক্রম গ্রহণ করা।
• স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও জেলা স্পেশাল ব্রাঞ্চের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেয়া।
• সরকার কর্তৃক অর্পিত অন্যান্য বিভিন্ন দায়িত্ব পালন।

আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন

১৯৭৬ সালে ৯ ব্যাটালিয়নের একটি রিজার্ভ বাহিনী গঠন করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন নাম দেয়া হয়। এই ব্যাটালিয়নের তত্ত্ববধায়ক হিসেবে একজন ডিআইজি আইজিপিকে সাহায্য করেন। নদী পথের জন্য একটি রিভার ব্যাটালিয়ন এবং কেবল নারী সদস্যদের নিয়ে একটি নারী ব্যাটালিয়নও আছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে মোট ১১ টি ব্যাটালিয়ন রয়েছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের। নদীপথ বা দূর্গম পার্বত্য অঞ্চলসহ সব জায়গাতেই পুলিশের এই ব্যাটালিয়নগুলো কাজ করছে।

প্রতিটি ব্যাটালিয়নে পাঁচটি কোম্পানী থাকে, আর প্রতিটি কোম্পানী ৩ টি প্লাটুনে বিভক্ত। প্রত্যেক ব্যাটালিয়নে সব মিলিয়ে ৬৪৭ জন পুলিশ সদস্য থাকেন।
দায়িত্ব
১৯৭৯ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই ব্যাটালিয়নকে যেসব দায়িত্ব দেয়া হয়েছে:
ক) অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা।
খ) বেআইনী অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক প্রভৃতি উদ্ধার।
গ) সশস্ত্র অপরাধী চক্র গ্রেফতার।
ঘ) আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় অন্যান্য ইউনিটকে সহায়তা প্রদান।
ঙ) বিভিন্ন সময়ে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত যে কোন কাজ।
সাফল্য
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়ে আসছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা দেয়া, গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান যেমন নির্বাচন আয়োজন, ভিআইপি নিরাপত্তা দেয়া প্রভৃতি দায়িত্ব পালনে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন সুনাম কুড়িয়েছ। বিভিন্ন আন্ত: ইউনিট ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও এই বিভাগের সাফল্য রয়েছে। এছাড়া ২০১০ সালের জুন থেকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তার সার্বিক দায়িত্ব নেবার পর থেকে সেখানকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রী হয়রানি রোধে বিশেষ ভূমিকা রাখেছে।